কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত

মার্কিন কোম্পানির ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপে পড়বে ইউরোপের ডেটা সার্বভৌমত্ব?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভীষণ উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভীষণ উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর বিনিয়োগের আকার অনেক দেশের অর্থনীতিকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালে শুধু এআই অবকাঠামোতেই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মূলধনি ব্যয় (ক্যাপএক্স) ৭০ হাজার কোটি ডলার ছাড়াতে পারে। শিল্প বিশ্লেষকদের ভাষায়, বর্তমানে মানব ইতিহাসের বৃহত্তম প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ পর্ব চলছে। কিন্তু এ বিনিয়োগে নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলো। এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগ কি মহাদেশটির ডেটা সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দেবে? খবর ইউরো নিউজ।

ওয়াল স্ট্রিটে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে চলতি বছরের কোম্পানিগুলোর প্রাক্কলিত মূলধনি ব্যয়। সম্মিলিতভাবে এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ হবে ৭০ হাজার কোটি ডলার। বিনিয়োগের এ আকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি সুইডেনের পুরো নমিনাল জিডিপির তুলনায় বেশি।

মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বৈশ্বিক চিপ বিক্রি চলতি বছর প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার ছুঁতে পারে। অন্যদিকে জেপি মরগান চেজ ও ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড কোম্পানির মতো ব্যাংক ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুসারে, উচ্চমাত্রার কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই খাতে সম্মিলিত মূলধনি ব্যয় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

চলতি বছরের লাফিয়ে ওঠা এ মূলধনি ব্যয় ২০২৫ সালে শুরু হওয়া সুস্পষ্ট পরিবর্তনেরই ধারাবাহিকতা। ওই বছর বিগ টেক কোম্পানিগুলো আনুমানিক ৪০ হাজার কোটি ডলার এআই খাতে মূলধনি ব্যয় করেছিল। এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেনসেন হুয়াং গত মাসে বলেছিলেন, ‘আমরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞের সাক্ষী হচ্ছি।’

২০২৬ সালের ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে অ্যামাজন, কোম্পানিটি ২০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তিনটি বাল্টিক দেশের সম্মিলিত নমিনাল জিডিপির তুলনায় চলতি বছর অ্যামাজনের একক এআই মূলধনি ব্যয় বেশি হবে। অন্যদিকে অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট ও মেটা বিনিয়োগ করবে যথাক্রমে ১৮ হাজার ৫০০, ১৪ হাজার ৫০০ ও ১৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এছাড়া ওরাকল আগে দেড় হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করলেও তা বাড়িয়ে ৫ হাজার কোটি ডলার করেছে। টেসলা প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করে ২ হাজার কোটি ডলার করেছে মূলত তাদের রোবোট্যাক্সি বহর সম্প্রসারণ এবং অপটিমাস হিউম্যানয়েড রোবট উন্নয়নের জন্য।

মরগান স্টানলির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ হাইপারস্কেলাররা প্রায় ৪০ হাজার কোটি ডলার ঋণ নেবে, যা গত বছর ছিল ১৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এ ঋণ বৃদ্ধির ঢেউ চলতি বছর উচ্চমানের মার্কিন করপোরেট বন্ড ইস্যুকে রেকর্ড ২ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দিতে পারে।

বিগ টেকের এআই প্রতিযোগিতা বিপুল ঋণনির্ভরতায় পরিচালিত হচ্ছে। এ কৌশল শেষ পর্যন্ত ফল দেবে কিনা এবং কারা বিজয়ী বা পরাজিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এ বিপুল ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সামনে জরুরি প্রশ্ন হয়ে উঠছে। কারণ প্রতিযোগিতা এখন কার্যত ব্যালান্স শিটের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা সবসময়ই ভাবনার বিষয়। মার্কিন কোম্পানিগুলো এক বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি ইউরো সমপরিমাণ অর্থ সংস্থা করছে, সেখানে ইইউর কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে সবচেয়ে কম ব্যয়কারী মার্কিন কোম্পানিকেও ছুঁতে পারছে না।

ব্রাসেলস ‘এআই ফ্যাক্টরিস’ উদ্যোগ এবং গত এপ্রিলে চালু হওয়া ‘এআই কন্টিনেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ একত্র করার চেষ্টা করেছে। পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬ সালে সার্বভৌম ক্লাউড ডেটা অবকাঠামোয় ইউরোপের সম্মিলিত ব্যয় মাত্র ১ হাজার ৬০ কোটি ইউরোয় পৌঁছাবে।

বার্ষিক হিসেবে এটি ৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের এআই অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞের তুলনায় কার্যত নগণ্য।

ফরাসি ইউনিকর্ন মিস্ত্রাল এআইয়ের সিইও আর্থার মেনসের মতে, ‘মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রতি বছর একটি নতুন অ্যাপোলো কর্মসূচির (চন্দ্রাভিযান) সমতুল্য প্রকল্প গড়ে তুলছে। ইউরোপ এআই অ্যাক্টের মাধ্যমে চমৎকার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তুলছে, কিন্তু শুধু নিয়ন্ত্রণ দিয়ে কম্পিউটিং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায় না।’

বর্তমানে এআই প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় প্রতিরোধের অল্প কিছু আলোর ঝলকানির একটি হলো মিস্ত্রাল। গত বছর কোম্পানিটি ১৭০ কোটি ইউরো বিনিয়োগ সংগ্রহের পর বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ কোটি ইউরোয়। এছাড়া চলতি বছর ১০০ কোটি ইউরো মূলধনি ব্যয়ের পরিকল্পনা জানিয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকদের সন্তুষ্ট করতে একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে। জার্মানি ও পর্তুগালের মতো দেশে লোকালাইজড ক্লাউড জোনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ডেটা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব প্রকল্প প্রযুক্তিগতভাবে এখনো মার্কিন মূল কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইউরোপীয় শিল্প মার্কিন অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতির প্রভাবের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ থেকে যায়।

আরও